Rabiul Awal

মরুর ভেতর সবুজ একটা বন

Published in arts and life.

মরুর ভেতর সবুজ একটা বন

আমার খুব অস্বস্তি আজকাল। অস্বস্তিতে পড়লে আমার দিশেহারা লাগে খুব। কিচ্ছু ঠিক থাকেনা। খেতে ভাল্লাগে না, পড়তে ভাল্লাগে না, কাজ করতে ভাল্লাগে না, ঘুমাতে ভাল্লাগে না। তো কাজ যে করতে পারি না তা নিয়ে খুব মন খারাপ হয় এবং নিজের উপর এক ধরণের বিরক্তিও তইরি হয় এইসব নিয়ে। তাবত বিরক্তি যখন আমি নিতে পারিনা তখন নানানজনকে ফোন দিয়ে যন্ত্রণা করি এবং নানান কথা পাড়তে থাকি। অধিকাংশই অগুরুত্বপূর্ণ কথা। গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি কাউকে খুব একটা বলিনা আজকাল। ইন ফ্যাক্ট, অধিকাংশ আলাপঅযোগ্য কথাবার্তা। সেসব কথা আমি মন দিয়ে বলি অন্যদের। তো ওগুলি এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না যা এখানটায় উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু এমন করলে একটা ক্লান্তি এসে জমা হয় শরীরে এবং মস্তিষ্ক খানিকটা হালকা হয়ে উঠে। খিদা লাগে এবং ভাত খেয়ে পড়তে বসি। পড়ার ফাঁকে পুরো বিষয়টা নিয়ে একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করাতে চাই। সংকট, অস্বস্তি এবং অগুরুত্বপূর্ণ আলাপ একসাথে কাঁধে কাঁধ রেখে জমায়েত হয়। দেখি অগুরুত্বপূর্ণ আলাপের ভেতরও কিছু কিছু আলাপ বারবার আসতে থাকে – নানাবিদ অনিশ্চয়তার কথা, কাজকর্মের দুশ্চিন্তা এবং নতুন করে তিতুন নামের তরুণীটিকে নিয়ে নানান গল্প তইরি হতে থাকে। অস্বস্তিগুলোর নির্দিষ্ট কোন উৎস আমি খুঁজে পাই না। জীবন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকে পড়ে দিনকেদিন। আমি ঠিক কিছুরই শামাল দিয়ে উঠতে পারছি না বলে মনে হতে থাকে। দেখি জীবন কঠিন এবং অপরিচিত হয়ে উঠছে। এই যেমন গত তিনদিনে দুশো পঞ্চাশ টাকা কেমন করে জানি খরচ হয়ে গেলো। তার উপর পকেটে একশো চার টাকা ছিলো তাও রাতের বেলা চা খেতে বেরুনোর সময় খুঁজে পেলাম না। হারিয়ে ফেলেছি হয়ত। এমন দিশেহারা ব্যাপার! তারপর দেখা গেলো কোন একটা জায়গা যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু পরবর্তীতে আমার আর যেতে ইচ্ছে করলো না। কিংবা চায়ের আড্ডায় বসে আছি কিন্তু আড্ডাটিকে ছুঁতে পারছি না। তারপর হাঁটতে শুরু করি। আমার খুব পেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অনেক দূর অবধি হেঁটে আসলে ক্লান্তিতা এতোটা ঘিরে ধরে যে আর কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করে না আর। গত চার বছরের আমার নিজস্বতার সবচে গুরত্বপূর্ণ অংশটি নিয়ে আমি স্বস্তি হারিয়ে ফেলেছি। শুরুতে আমার খুব ভালো লাগতো অনেক কিছুই। তারপর আস্তে আস্তে আমার অপরিচিত লাগতে শুরু করে চারপাশ। আমি কিছুই সহজ করে নিতে পারিনা, অভ্যস্ত হতে পারি না এবং দম বন্ধ হয়ে আসে। তারপর আমি সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে আসি ঘরে। একটি নার্সিসিস্ট ভাঁড় এবং শুয়োর পর্যায়ের উপাচার্য্য এই এলাকাটিকে ভয়ানক অসুস্থ করে তুলেছে। আদতে বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন আমার কাছে লাল সবুজ বাতিদিয়া ঘের দেয়া মাজার মনে হয় এবং ওদিকে আমি যেতে চাই না একদমই। মাজারে কোন সৃষ্টি নেই। আগামী নেই। গতি নেই। শব্দ নেই। গণিত ও দর্শন নেই। যাবতীয় না থাকা এখানে। তো ঘরের ভেতর পড়ে থাকি এবং কাজ করি।    

তো কার কাছে গেলে স্বস্তি পাবো এমন একটা ভাবনা গত কদিন ধরে আমি ভাবছিলাম। তেইশ বছর বয়সে এসে অস্বস্তি হয়ত অনিয়মিত কিছু নয়। কিন্তু স্বস্তি পাওয়াটা একটা ভালোরকম সমস্যা হয়ে উঠেছে। কারণ সস্তিটা আমার খুব দরকার। কাজ করবার জন্য, পৃথিবীকে দেখবার জন্য, সবুজ সৃষ্টির জন্য, ভাঙচুরের জন্য আমার স্বস্তি চাই। তিতুন। আমার ছাত্রী। একাদশ শ্রেণিতে পড়ে সে। আমি তাকে গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞান পড়াই। সে কি আমাকে স্বস্তি দিতে পারে? ওর পারবার আছে অনেক কিছু কেননা সে এখনো সবুজ, শুভ্র, সুন্দর এবং শক্তিশালী। তো এমন দুয়েকজন ছাত্রছাত্রী পড়াতে আমার আসলে ভাল্লাগে না। আমার ভালো লাগে কানায় কানায় ভর্তি ক্লাসরুম। ক্লাসের এমাথা থেকে ও মাথায় হেঁটে শরীর দুলিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলা যায় এমন ক্লাস চাই আমার। অমন ক্লাসে গেলে আমার খুব আনন্দ হয়। তবুও দুয়েকজনকেই পড়াতে হয় কেননা অমন লম্বা ক্লাস আমি কোথায় পাবো? আর এমন দুয়েকজনের বাসায় খেটেখুতে বারোচৌদ্দদিনে একটা ভালোরকম পয়সা পাওয়া যায়। অবশ্য অর্থবিষয়ক আমার খুব একটা অস্বস্তি নেই। সস্তিটা অন্য কোথাও খোঁজ করা লাগে তাই। আমি একটা ভাবনা এমন এগুতে চাই যে তিতুন আমাকে স্বস্তি দিতে পারে। হ্যাঁ, এই ভাবনাটা সত্যিই এগুতে থাকে। তারপর যেটা হয় তিতুনকে আমি খুব ভাবতে থাকি। সেই ভাবনা একটা ব্যক্তিগত এথিক্যাল অস্বস্তিতে আকার নিতে চায়। আমি সেদিকে আগাই না। আমি দ্রুত পায়ে পথ হাঁটতে থাকি এবং ভাবি। শহীদ মিনার এলাকায় টং দোকানে এসে থামি। এই জায়গাটা আমার ভালো লাগে। এখানে একটা সাইলেন্স সাইলেন্স সাউন্ড আছে। তো ভাবনাটা এগোয়। তিতুন এবং স্বস্তি পাওয়া দুটোই লিনিয়ারলি ইস্টাবলিশ করতে চাই আমি। তারপর আমার এখন তখন তিতুনকে মনে পড়ে খুব। কিংবা এমন হয়যে আমি ভাবি আমার তিতুনকে খুব মনে পড়ছে। কারুর কাছে ঝুলে আছি, একটা নির্ভরতার জায়গা পাওয়া গেলো বলে এক ধরণের সাময়িক স্বস্তিও পাওয়া যায়। নির্ভরতার কাছাকাছি ইশ্বরের বসবাস। নির্ভরতা, ইশ্বর এবং শান্তি কাছাকাছি হয়ত। ওগুলো আমার চাই আসলে। ঘরে ফিরে আমি চেলসি হোটেল ২ বাজাই কম্পিউটারে। টেবিলের ডান কোণায় সারি করা নানান বইপত্র। তার পাশেই অনেকগুলো টিব্যাগ। আবুল হাসানের কবিতার বইসহ গবেষণার জন্য জমা করা বইপত্রগুলো দেখে আমার ভাল্লাগে। কোলাহলের ভেতর আমার যেতে ইচ্ছে করে না এখন আর। ক্যাওটিক পিপলস আমাকে খুব ক্লান্ত করে। শুয়োরের পালদের নিয়ে পড়ে থাকারচে এইসব বইপত্র নিয়ে পড়ে থাকা, কবিতার বইয়ে দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা তিতুনকে গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো সুন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আমার কাছে। লিওনার্ড কোহেনের গান বাজতে থাকে। লানা দেল রে এবং এডাম কোহেন খুব ভালো করে গায় গানটি। লানা দেলরে মুখায়ববের দিকে তাকিয়ে এক দারুণ গভীরতায় ডুবে যেতে থাকি আমি। শব্দ। নরম সুর। আর সস্তিদায়ক নারী। তারপর চেলসি হোটেল ২ বাজতে থাকে বারবার। অনেকবার। মাথাটা টেবিলের উপর ঠুকে দিয়ে আমি শব্দের ভেতর প্রবেশ করি এবং লুপেহোল যাত্রা। ঘরের ভেতর একটা আধো নীলচে অন্ধকার ঠিকরে পড়ে। লানা দেলরে অতিক্রম করে তিতুনর দিকে এগুতে থাকি হঠাত। তিতুন। আমার ছাত্রী। গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান পড়াই ওকে আমি। ওর দিকে তাকাতে ভয় হয় আমার। ওর অবয়বের দিকে তাকিয়ে আমি বিকাল/ দুপুরগুলোতে বলতে থাকি পৃথিবীর গতি, আকর্ষণ, বস্তুর ধর্ম, স্থিতিস্থাপকতা এবং ঘর্ষণ বিষয়ক নানাবিদ থিওরি। সপ্তাহে তিন দিন আমাদের দেখা হয়। আসলে তিতুনের দিকে তাকাতে পারি না আমি। আমার মনে হয় তাকালেই পুরো পৃথিবী তাবত ভেঙ্গে পড়বে। সাত আসমান এক হয়ে মাটিতে মিশে যাবে। এবং আমি একটা ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়ে যাবো। তবুও অবয়বের মধ্য থেকে আমি ওকে দেখি। ওর দিকে তাকালে পৃথিবীকে খুব সুন্দর মনে হয়। আমার চারপাশ সহজ হয়ে উঠে কিছুটা। তিতুন। তরুণী থেকে নারী হয়ে উঠছে ও। যুবতী হবার শলাকলা রপ্ত করছে। শরীরে জাগছে নতুন চর। সেসব আমি তার চোখ, মুখায়ব এবং শব্দে দেখতে পাই। সেগুলিকে আমি খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাই না। অস্বস্তির একটা কুলকিনারা করা লাগবে আমার। ওর সাথে অনেক কথা বলবার আছে আমার। কিন্তু বলা হয়ে উঠেনা কিছুই। গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের অনেক চ্যাপ্টার বাকি পড়ে থাকে এবং পরীক্ষার আর মাত্র দুমাস বাকি। অনেক তাড়া এখানে।  

একটা হ্যালুসিনেশন শুরু হয় আমার হুট করে। যে গলি দিয়ে ও আসে প্রতিদিন সে গলি ধরে আমিও এগুচ্ছি। শহরের দিকে। আমি দেখি দূর থেকে নেভী ব্লু রঙা কোর্তা পরা এক তরুণী এগিয়ে আসছে। তারপর নিয়মিত পড়ার টেবিলে আমি এক ঝটকায় ছুটে যাই। নেভী ব্লু কোর্তা, মুখাবয়ব, আঙ্গুলে গাঁথা কলম, খাতার পাতা আর আমার তিতুন! প্রায়শই ও আসে অমন, চুলগুলো খোপা করে বেঁধে নেভী ব্লু রঙা ওকে দেখতে পাওয়া যায় টেবিলে সামনে ঝুঁকে অঙ্ক করছে। পকেটে পয়সা ছিলোনা বলে পুরো পথ হেঁটে পড়াতে আসতে হয়েছে আজ। আসার পর জানা গেলো আজ তিতুন নেই। আহারে! তারপর যেহেতু নতুন মাসের কটা দিন পার হয়ে গেলো মাসের বেতনটা পাবার একটা সূক্ষ্ম আশাও ছিলো। কিন্তু শেষবেলায় দেখা গেলো কেউ কোন খাম নিয়ে এগিয়ে আসেনি। তো একটা বিরক্তিকর হতাশা নিয়ে গলির পথ ধরে হাঁটতে থাকি আমি। কিছুদূর এগোনোর পর আমার মনে হয় গলির মুখ থেকে সে এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ, নেভী ব্লু রঙ ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছি। আমি নিশ্চিত হতে চাই এবং দেখি চুলের বাঁধন একই রকম, জামার ধরনটাও তাই। তো ওকে কিসব বলা যায় এক মুহুর্তে ভেবে নিই। আসলে ভাবতে হয় না, আমার মনে হয় কথাগুলি অনেক আগ থেকেই জমা করা ছিলো, পরিস্থিতিতে সামনে চলে এসেছে। তো আমরা যখন অবয়ব দূরত্ব পার হয়ে দৃশ্যমান দূরত্বে এসে এগুতে থাকি তখন খুব হতাশ হবার মতন একটা ব্যাপার ঘটে। এবং দ্রুত পা পেলে বিব্রতকর গলিটা পার হয়ে আসা ছাড়া আমার আর করবার কিছু থাকে না। কিছুটা এগিয়ে আসার পর দেখি, দুপুরের রোদে টমটমের ভেতর তিতুন বসে আছে। সে আমাকে অতিক্রম করে ছুটে যাচ্ছে বিপরীত দিকে। সেই নেভী ব্লু জামা, সমান উচ্চতা, হালকা চিপচিপে শরীর, একই ঢঙ্গে খোঁপা করা। এমন একটা হ্যালুসিনেশন নিয়ে আমি ঠিক স্বস্তি পাই না। আমার খুব খুদা পায় ঘরে ফিরে এবং ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।  

দুপুরবেলা। ঘরের ম্যারম্যারা দেয়ালগুলোতে কেমন জানি একটা থমকে থাকা ব্যাপার। একটা নিস্তব্ধতা। নিশ্বাসের শব্দটা ঠিকঠাক আঁচ করা যায়। ঠিক স্বস্তিদায়ক সময় নয় আসলে। এমন সময়টাতে কেউ বাসায় থাকেনা। এমন একটা সময়ে ঘুম ভাঙলে অসস্তিতা মেরুদণ্ড বরাবর এগুতে থাকে এবং খুব একা একা লাগে। তো আবার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে আমার। এমন একটা ব্যাপার দিয়ে দিন শুরু করতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু ঘুম আসেনা। নীরাকে মনে পড়ে হঠাত এবং একটা শক্তিশালী দুর্বিনীত তাড়না নিজেকে জাগিয়ে তোলে। নীরা। তামাটে শরীর ওর। আর সবুজ দেহ। সেদিন চায়ের টঙে কাকে যেন বলছিলাম তামাটে রঙ মানে আদিম, বন্যতা, ওয়াইল্ড একটা ব্যাপার। তো নীরাকে জানলাম অল্প কদিন হয়। ওর মধ্যে চোখে পড়বার মতন খুব একটা ব্যাপার নেই। ওয়াইল্ড শরীর আর অন্যত ও হেঁটে যায় দ্রুত এবং ওর শব্দ খুব বোল্ড – এইতো। তো একদিন দূর থেকে ওর অবয়ব দেখি আমি। গুরুত্বসহকারে বিষয়টাকে বিবেচনা করতে হয় কেন জানি এবং আমি সেখান থেকে সরে যেতে পারি না। ইশকুলে পড়বার বয়স হলে হয়ত তওবা করে সরে পড়তাম। কিন্তু এখন পারা যায় না।  

খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে নয় তবুও বিভাগের করিডরে আমি ওকে আরো দুচারবার দেখি এবং একটা নেইভ ওয়াইল্ডনেস আমাকে অতিক্রম করতে থাকে। তো অন্য এক সন্ধ্যেয় আমি ভাবি নীরাকে। ভাববার মতন অবসর আজকাল খুব একটা পাওয়া যায় না। নানান কাজে পড়ে থাকা লাগে, সকালটা শুরু হয় ছোটাছুটির মধ্যে, দুপুরের খাবারের পর এক রকম ঘুম পায়, অনেক রাতে ঘুমাতে যাই। তো নীরাকে ভাবি সন্ধ্যেয় বা দুপুরে। ভাবনাটা খুব একটা আলাপযোগ্য নয়। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি। নীরা। ম্যারম্যারা দুপুরে আমার রক্তবিন্দুতে সে জেগে উঠে। দেখি, ধীরে ধীরে আমার গভীরে ফুটে উঠছে সে। ঘরের ভেতর শাদা বাতির স্পষ্ট আলো তবুও ঘরটা বেশ অন্ধকার লাগে আমার কাছে। ঘরের পশ্চিম দেয়ালে, জানালার বিপরীত দিকটায়, রম্বসাকৃতির একটা মৃদু আলো এসে জায়গা করে নিতে থাকে। তাকিয়ে দেখি সেখানটায় নৃত্য করে জনৈক কলোম্বিয়ান তারকা। তীব্র গতিতে সে তারকা নৃত্য করে, তাবত পুরুষজাতিকে তার কোমরের কসরতে কাবু করে যায়, তার সস্তিদায়ক স্তনদুটির সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের তেতলা নীল দালানটি কেঁপে কেঁপে উঠে, সে ছুটে চলে আলোছায়ার ভেতর।  দুলতে থাকে দুপুর। 

I never really knew that she could dance like this 
She makes a man wants to speak Spanish 
Como se llama (si) 
Bonita (si) 
Mi casa (Shakira Shakira), su casa 

আমার কোন তাড়া নেই। আলোছায়ায় সেসব ওয়াইল্ডনেসের ভেতর আমি মন দেই। ঘরটা একটা বন হয়ে যায়। দেয়াল নেই, বাতি নেই, করিডর নেই। মরুর ভেতর সবুজ একটা বন। তামাটে রঙা নীরা। আমি নীরাকে খুলতে থাকি প্রখর উচ্ছ্বাসে। খসে পড়ে সভ্যতা। (ছোটবেলায় আমার একটা ঘড়ি ছিলো। অন্ধকারে সে ঘড়িটি জ্বলতো। রেডিয়াম থাকায় নরম সবুজ আলো হতো তাতে। তীব্র অন্ধকারের ভেতর অমন আলো দারুণ একটা ব্যাপার।) কলোম্বিয়ান তারকাটিকে আর খুঁজে পাই না। মনে হতে থাকে একটু আগে নীরার কোমরই দুলছিলো। আই স্টার্ট রিডিং দ্য সাইনস অব হার বডি (উনো, দোস, ত্রেস, কোয়ার্তী)। সবুজ আলোতে দখল হয়ে যাই, মাঠের পর আমরা মাঠ আমরা চষে বেড়াই, নীরা আমাকে অনেক উঁচু থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় নির্দয়ভাবে, আমি গভীরে নামতে থাকি, পাহাড়ের পর পাহাড় আমরা ডিঙোতে থাকি। আবুল হাসানের কবিতার বইয়ের পাতাগুলো শব্দ করে খুলে যেতে থাকে, অমাবস্যার প্রচন্ড ভয়ার্ত অন্ধকারের ভেতর শুধু নীরাই স্পষ্ট হতে থাকে, সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে আমি কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা, কেঁপে উঠে শহর, আবুল হাসানের কবিতা আওড়াতে থাকে অদূরে কেউ যেন, মরুপ্রান্তর পার হয়ে যাই, সমুদ্রের গর্জনের ভেতর নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ লাগে, চেলসি হোটেল ২ নরম শব্দ করে বেজে চলে। দেয়াল দূরে সরে যায়, সরে যায়, শহর পার হয়ে আসি আমরা, বন, সবুজ, সবুজ এবং আরো সবুজ, তামাটে রঙা নীরা, এগুতে থাকি, এগুতে থাকি, এগুতে থাকি, ভাঙতে থাকি, ভাঙতে থাকি, গড়তে থাকি, গড়তে থাকি, ওয়াইল্ডনেস, ওয়াইল্ডনেস, ওয়াইল্ডনেস, তামাটে রঙা এক ওয়াইল্ডনেস।  

তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে আরাম লাগে। আমার মনে হয় আজ রাতে অনেক কাজ করা যাবে। অনেক কাজ করি। ব্যস্ত হয়ে উঠি আবারো। করিডরে দাঁড়াবার সুযোগ হয় না। কাজ করি, পড়ে থাকি। দুপুর আর সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় কখনো কখনো নীরা জাগিয়ে রাখে, লুটায়া দেয়। সবুজের ঘ্রাণ ডুবে যাই আর আরো মানুষ হয়ে উঠি। 

Comments

comments